শিরোনামঃ-

» অস্তিত্ব সঙ্কটে জাতীয় বাঁশ উদ্যান

প্রকাশিত: ২৮. জানুয়ারি. ২০১৭ | শনিবার

Manual2 Ad Code

রায়হান উদ্দিন নয়ন (বিশেষ প্রতিনিধি): জাতীয় বাঁশ উদ্যান। ২০১৩ সালে ডাক-ঢোল পিটিয়ে যার যাত্রা শুরু হয়েছিল।

রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মাত্র তিন বছরের মাথায় সাইনবোর্ড সর্বস্ব এই উদ্যানটি বাঁশশুণ্য হয়ে রুপ নিয়েছে ঘাস উদ্যানে। অযত্ন আর অবহেলায় ভেস্তে গেছে বনবিভাগের উদ্যোগে গড়ে উঠা দেশের একমাত্র এই বাঁশ উদ্যানটি।

Manual6 Ad Code

‘গরীবের কাঠ’ খ্যাত এই বাঁশ দেশ থেকে এমনিতেই হারিয়ে যেতে বসেছে। তার উপর বাঁশ সংরক্ষণে বন বিভাগের এই উদ্যোগটি সফলতার মূখ না দেখায় দেশে বাঁশের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার ব্যাপারে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

বন বিভাগের তথ্য মতে, ২০১৩ সালের ৬ জুন ২৪ প্রজাতির প্রায় ৭০০টি চারা রোপনের মাধ্যমে উদ্বোধন করা হয় জাতীয় বাঁশ উদ্যানের। সিলেট বিমানবন্দর সড়কের পাশে পর্যটন মোটেলের বিপরিতে ৩০ একর জায়গায় অবস্থিত বন বিভাগের (ফরেস্ট্র্রি সায়েন্স অ্যান্ড টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট (এফএসটিআই)।

এর পরিত্যাক্ত দু’টি টিলা ও সমতল ভূমির প্রায় ১.৪১৭ হেক্টর তথা ৩ একর জমি নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছিল বাঁশ উদ্যানটি। প্রায় দুই লক্ষ টাকা ব্যায়ে ‘জীব-বৈচিত্র সংরক্ষণ ও ইকো-ট্যুরিজম উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় বন বিভাগের তৎকালীন প্রধান বন সংরক্ষক মো. ইফনুছ আলী উদ্যানটির উদ্বোধন করেন।

Manual4 Ad Code

প্রায় বিলুপ্ত এমন সব প্রজাতির বাঁশ সংরক্ষণ ও উৎপাদন বাড়ানো এবং পর্যটকদের আকর্ষণ করাই ছিল প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য। তাছাড়া উদ্যানটি উদ্ভিদ ও জীববিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের গবেষণা কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে ও মনে করা হয়েছিল। কিন্তু জাতীয়করণ করার আগেই বিলীন হয়ে গেল এর অস্তিত্ব।

বন বিভাগ সূত্র ও ফটকে লাগানো সাইনবোর্ডে দেওয়া তথ্যানুসারে উদ্যানে লাগানো বাঁশের মধ্যে কলসি, পেঁচা, রুপাহি, টেংগা,জাই, মূলি, থাই বরুয়া, কাটা বরুয়া, পলি মরকা কঞ্চি, বুদুম, কালী, সোনালী, ডলু, মাকাল, মৃতিঙ্গা, বেতুয়া,  ওড়া, তেতুয়া, পরুয়া, বরুয়া, বোতম, রঙ্গন ও পারুয়া এসব বিচিত্র নামের ২৪ প্রজাতির বাঁশ লাগানো হয়েছিল উদ্যানটিতে। কিন্তু এখন আর এগুলোর অস্তিত্ব খূজে পাওয়া মুশকিল হয়ে পড়েছে উদ্যানটিতে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, পর্যটন মোটেলের বিপরীতে উদ্যানের প্রবেশমূখের প্রধান ফটকে বাঁশ উদ্যানের নাম সংবলিত একটি সাইনবোর্ডে বাঁশের জাত, নাম ও উদ্যানের তথ্যাদি দেওয়া রয়েছে।

সাইনবোর্ডটি দেখে উৎসূখ পর্যটকরা ভেতরে প্রবেশ করে নিরাশ হয়ে মূখ ভেংচিয়ে বেরিয়ে আসতে দেখা যায়। মাঠ আর টিলা মাড়িয়ে উদ্যানে প্রবেশ করার পর বাঁশের অস্তিত্ব খূজে পাওয়া দূষ্কর হয়ে পড়ে। ৭০০টি চারার মধ্যে সর্বসাকুল্যে ১০ থেকে ১৫টি রুক্ষ-সুক্ষ বাঁশ টিকে আছে উদ্যানের এক পাশে।

মাথা উঁকি দিয়ে যেন উদ্যানের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে বাঁশ ক’টি। এটিই বাঁশ উদ্যান কি না সন্দেহ হলে পাশের মাঠে খেলতে থাকা কয়েকটি ছেলেকে জিগেস করলে তারা বললো এ ব্যাপারে তারা কিছু জানেনা। পরে পাশের (ফরেফস্ট্র্রি সায়েন্স অ্যান্ড টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট (এফএসটিআই) এ গিয়ে বন সংরক্ষকের দায়ীত্বে থাকা আনোয়ার হোসেনের সাথে আলাপ করে নিশ্চিত হওয়া গেল যে, এটিই বিলীন হয়ে যাওয়া জাতীয় বাঁশ উদ্যান।

তিনি বলেন- আমি দায়িত্বে আসার পর শুধু সাইনবোর্ডেই দেখছি কিন্তু বাস্তবে উদ্যানের অস্তিত্ব নেই। উদ্যানের ব্যাপারে বন বিভাগের উদাসিনতার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, বৃষ্টিপ্রবণ অঞ্চল হওয়ায় পরিবেশগত কারণে সিলেট বাঁশ চাষের জন্য খুবই উপযোগী।

তবে একসময় বাঁশের উৎপাদন বেশি হলেও বর্তমানে সিলেটে অতি প্রয়োজনীয় এ বাঁশের উৎপাদন দিন-দিন আশষ্কাজনক হারে হ্রাস পাচ্ছে। বাঁশের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে বন বিভাগকে সময়োপযোগী সিদ্বান্ত নিতে হবে বলে তিনি মনে করেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বন বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, সয়েল টেস্ট না করেই এখানে বিভিন্ন প্রজাতির বাঁশ লাগানো হয়েছিল। ফলে এখানকার মাটির সাথে ম্যাচ না করতে পেরে টিকে থাকতে পারেনি বাঁশগুলো।

এ ব্যাপারে সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আর এস এম মনিরুল ইসলামের সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, বন বিভাগের একটি ভালো উদ্যোগ হলেও দুর্ভাগ্যবশঁত বাঁশ উদ্যানটি টিকিয়ে রাখা যায়নি।

Manual7 Ad Code

তবে আমরা এ প্রকল্পটি মৌলভীবাজারে বাঁশ-বান্ধব কোন এলাকায় পুণরায় চালু করার চেষ্টা করবো। আর বর্তমান উদ্যানটিতে আমরা বনজ, ঔষধী সহ দেশের সকল প্রজাতির গাছের একটি ‘আরবোরেটাম’ করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।‘সাসটেইনেবল ফরেস্ট আ্যন্ড লাইভলিহুড (সুফল)’ নামে এ প্রজেক্টটি আগামী বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর মাসের দিকে প্রায় ৩৭ একর জায়গা নিয়ে করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে তিনি জানান।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)’র সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কিম বলেন- বন বিভাগের উদাসীনতা নতুন কিছু নয়। এর আগেও তারা বিভিন্ন প্রকল্প করে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। বাঁশ উদ্যানটি একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ ছিল বটে কিন্তু কিছু অসাধু কর্মকর্তার উদাসীনতা আর অপরিচর্চার অভাবে উদ্যানটি ধংস হয়ে গেছে। অর্থলোভী এসব অসাধু কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময় নানা প্রজেক্ট দেখিয়ে নিজেদের পকেট ভারি করে মাত্র।

কোন প্রকল্পই তারা বেশিদিন ধরে রাখতে পারেনা। ধারাবাহিক পরিচর্যা না থাকলে প্রকল্প কোন দিনই টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। তাই নতুন নতুন প্রকল্প না করে বন বিভাগকে পুরনো প্রকল্পগুলোর পরিচর্যা করে টিকিয়ে রাখার দিকে নজর দেয়ার পরামর্শ দেন পরিবেশ আন্দোলনের এ কর্মী।

Manual3 Ad Code

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৭৫৩ বার

Share Button

Callender

June 2026
M T W T F S S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
2930