শিরোনামঃ-

» ‘ভুয়া’ মুক্তিযোদ্ধা সুব্রত চক্রবর্তী জুয়েল! মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কোন পরিচয় পাওয়া যায়নি তাঁর

প্রকাশিত: ০১. জুন. ২০১৭ | বৃহস্পতিবার


Manual8 Ad Code

সিলেট বাংলা নিউজঃ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সিলেট জেলা ইউনিটের কমান্ডার তিনি।

Manual2 Ad Code

অথচ মুক্তিযোদ্ধাই নন। সিলেট মহানগর মুক্তিযোদ্ধা যাচাই বাছাই কমিটি তাকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে চিহ্নিত করে নোটিশ টানিয়েছে।

মঙ্গলবার (৩০ মে) সিলেট জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে টানানো নোটিশে আরো অনেকের সঙ্গে অ-মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সিলেট জেলা ইউনিটের কমান্ডার সুব্রত চক্রবর্তী জুয়েলের নামও রয়েছে।

সুব্রত চক্রবর্তী জুয়েলের মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে বিতর্ক অনেক আগে থেকেই রয়েছে।

মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ের পক্ষে তার কোন প্রমাণ না থাকলেও সুব্রত চক্রবর্তী জুয়েলই হয়ে উঠেন সিলেটে মুক্তিযোদ্ধাদের অভিভাবক। তাকে এ পথটা তৈরি করে দিয়েছিল এক এগারোর অস্থির সময়।

গঠনতন্ত্র বহির্ভূত পদ সৃষ্টি করে তাকে বসানো হয় অভিভাবক হিসেবে। সেই থেকে তার দাপুটে পদচারণা। দুর্নীতির অভিযোগও জমতে থাকে তখন থেকেই। যেগুলোর তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুর্নীতির অভিযোগে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সিলেট জেলা ইউনিটের কমান্ডার সুব্রত চক্রবর্তী জুয়েলের বিরুদ্ধে মামলাও করেছে দুদক। দুদকের এ মামলায় জেলও খেটেছেন তিনি। মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ৩ কোটি ৫২ লাখ ৮০ হাজার টাকা, মুক্তিযোদ্ধা প্রকল্পের ১৪ লাখ টাকা, মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ দেয়া ১৩টি কম্পিউটার, কয়েদির মাঠে গরুর হাটের খাজনা বাবদ প্রাপ্ত টাকা আত্মসাতের অভিযোগ সহ দুর্নীতির পাহাড় প্রমাণ অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। তবে সব ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠেছে তার ‘মুক্তিযোদ্ধা’ পরিচয় নিয়ে ওঠা প্রশ্নটাই।

মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সিলেট মহানগর ইউনিটের কমান্ডার ভবতোষ রায় বর্মণ জানান, সুব্রত চক্রবর্তী যাদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন বলে দাবি করেছেন তারা অনেক আগেই সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। এদের একজন হচ্ছেন মিরাবাজারের বাসিন্দা পুরেঞ্জয় চক্রবর্তী বাবলা, যিনি যুদ্ধকালীন সময়ে ৫ নম্বর সেক্টরে যুদ্ধ করেছেন। তার সঙ্গে কথা হয় মানবজমিনের।

তিনি বলেন- যুদ্ধকালীন সময়ে সুব্রত চক্রবর্তীর সঙ্গে আমার কোথাও দেখা হয়নি। তিনি কোথায় যুদ্ধ করেছেন, কোথায় প্রশিক্ষণ নিয়েছেন তা তিনিই ভালো বলতে পারবেন।

৫ নম্বর সেক্টরে থেকে পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে দাপিয়ে বেড়ানো আবদুল হান্নানও বলছেন বিবৃতি দিয়ে তারা এ বিষয়টি পরিষ্কার করেছেন। তিনি জানান, সুব্রত চক্রবর্তী তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করেননি। তিনি এও তথ্য দেন, প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের কেউই বলবেন না সুব্রত চক্রবর্তী মুক্তিযুদ্ধ করেছেন বা প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।

৪ নম্বর সেক্টরে যুদ্ধ করেছেন মুক্তেশ্বর পাল। তিনিও অস্বীকার করছেন সুব্রত চক্রবত্ততীর সঙ্গে যুদ্ধ করার কথা। তিনি জানান, যুদ্ধকালীন সময়ে সুব্রত চক্রবর্তীকে কোথাও দেখেননি তিনি।

দুদকের অনুসন্ধানেও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সুব্রত চক্রবর্তী জুয়েলের নাম খুঁজে পাওয়া যায়নি। গত ১৬ই জুলাই জমা দেয়া দুদকের এক অনুসন্ধান প্রতিবেদনে দুদক সিলেট সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপ পরিচালক রাম মোহন নাথ সুব্রত চক্রবর্তী জুয়েলকে ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার’ হিসেবে চিহ্নিত করে উল্লেখ করেন, ‘সংগৃহীত রেকর্ডপত্র যথা বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় কর্তৃক বাংলাদেশ গেজেট, অতিরিক্ত সংখ্যা, শনিবার, জুন, ২০০৫ প্রকাশিত গেজেট-এর কপি যাতে সিলেট বিভাগের সকল মুক্তিযোদ্ধাদের নামের তালিকা রয়েছে।

Manual4 Ad Code

লালমুক্তিবার্তার খণ্ড নং-৮৯ ও ১০০, যাতে সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার মুক্তিযোদ্ধাদের নামের তালিকা রয়েছে। উল্লিখিত রেকর্ডপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, তাতে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অভিযুক্ত জনাব সুব্রত চক্রবর্তী (জুয়েল) এর নাম নেই।’ তবে কিভাবে মুক্তিযোদ্ধা হয়ে উঠলেন সুব্রত চক্রবর্তী জুয়েল? এমন প্রশ্নের ব্যাখ্যা দিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধারাই।

Manual7 Ad Code

২০০৮ সালের ৭ই নভেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে সিলেট জেলা ইউনিটের তৎকালীন কমান্ডার আহ্বায়ক মাহমুদ হোসেন লিখিত বক্তব্যে সুব্রত চক্রবর্তী জুয়েলের আদ্যোপান্ত তুলে ধরেন। সে বক্তব্যে সুনামগঞ্জের বাসিন্দা সুব্রত চক্রবর্তী জুয়েলের মুক্তিযোদ্ধা হয়ে ওঠার বর্ণনা দেয়া হয়।

সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়, টাকা আত্মসাতের দায়ে সোনালি ব্যাংক জালালাবাদ সেনানিবাস শাখার ম্যানেজারের চাকরিটি চলে যাওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের পার্বত্য চট্টগ্রাম জুস প্ল্যান্টে ম্যানেজার হিসেবে যোগ দেন।’ মুক্তিযোদ্ধারা বলছেন তখনই মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার শখ জাগে সুব্রত চক্রবর্তীর। পরবর্তীতে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কোনো গেজেটে নাম না থাকলেও তৎকালীন কমান্ডকে ‘ম্যানেজ’ করে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হন তিনি।

মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সিলেট জেলা ইউনিটের সাবেক কমান্ডার মো. সামসুদ্দোহা ২০১২ সালের ২৫শে নভেম্বর সুব্রত চক্রবর্তী জুয়েলকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে উল্লেখ করে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। পাশাপাশি তিনি মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় ব্যবহার করে জুয়েলের দুর্নীতির বিষয়ও তুলে ধরেন ঐ অভিযোগে।

Manual1 Ad Code

সারা দেশে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কার্যক্রম পরিচালনার লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ২০১৬ সালের ১২ই জানুয়ারি এক গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সব উপজেলা, জেলা ও মহানগরের জন্য কমিটি করে। এরই অংশ হিসেবে সিলেট মহানগরের জন্য ৬ সদস্যের একটি কমিটি গঠিত হয়। এনায়েত উদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে গঠিত কমিটিতে সদস্য সচিব হিসেবে রাখা হয় সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শহিদুল ইসলাম চৌধুরীকে।

কমিটিতে কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের প্রতিনিধি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন মুজিবুর রহমান চৌধুরী, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি হিসেবে স্থান পান মন্তাজ আলী, জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) প্রতিনিধি হিসেবে ছিলেন চিত্তরঞ্জন দেব, মহানগর কমান্ডের প্রতিনিধিত্ব করেন মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সিলেট মহানগর ইউনিটের কমান্ডার ভবতোষ রায় বর্মণ।

২০১৬ সালের নভেম্বরে তথ্য আহ্বান করলে সুব্রত চক্রবর্তী জুয়েলের বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা পড়ে ঐ কমিটিতে। তথ্য প্রমাণাদি বিশ্লেষণের পর ঐ কমিটি সুব্রত চক্রবর্তী জুয়েলকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে চিহ্নিত করে।

লেখক: চৌধুরী মুমতাজ আহমদ

কৃতজ্ঞতায়: মানবজমিন

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৯২৪ বার

Share Button

Callender

September 2026
M T W T F S S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930