শিরোনামঃ-

» প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ; মৃত চেলায় দিনরাত ড্রেজার, ৪৮ ঘণ্টায় ২০ কোটি টাকার বালু লুটের অভিযোগ, দেখার কেউ নেই

প্রকাশিত: ০৪. অক্টোবর. ২০২৬ | রবিবার

Manual4 Ad Code

পরিবেশ-প্রতিবেশ হুমকিতে, বিলীন কলাবাগান-গেদুর ঢালা; বিএনপি-আওয়ামী লীগ-জামায়াতের সমর্থকদের যোগসাজশের বালু লুটপাট চল‌ছে!

ছাতক প্রতি‌নি‌ধিঃ
সুনামগঞ্জের ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলার সীমান্তঘেঁষা চেলা নদীর একটি অংশ এখন বালু উত্তোলনের ভয়াবহ চাপে বিপর্যস্ত।

স্থানীয়ভাবে ‘মৃত চেলা’ নামে পরিচিত নদীর ওই অংশে দিন-রাত চলছে ড্রেজার ও সেভ মেশিন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, শতাধিক ড্রেজার ও বালু উত্তোলনকারী যন্ত্র বসিয়ে নির্বিচারে নদীর তলদেশ থেকে বালু তোলা হচ্ছে। তাঁদের দাবি, মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় অন্তত ২০ কোটি টাকার বালু উত্তোলন করা হয়েছে।

অবাধে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ বদলে যাচ্ছে। কোথাও তৈরি হচ্ছে গভীর গর্ত, কোথাও ভেঙে পড়ছে নদীর তীর।

এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বসতবাড়ি, কৃষিজমি, সড়ক, মসজিদ, মাদ্রাসা ও কবরস্থানের ওপর। স্থানীয়দের আশঙ্কা, এখনই বালু উত্তোলন বন্ধ করা না গেলে আগামী বর্ষা মৌসুমে ব্যাপক ভাঙন দেখা দিতে পারে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দা‌বি,দীর্ঘদিন ধরে বালু উত্তোলনের কারণে কলাবাগান ও গেদুর ঢালা নামে পরিচিত দুটি বিস্তীর্ণ এলাকা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

একসময় ‘গেদুর ঢালা খাল’ নামে পরিচিত এলাকাটি বর্তমানে বিশাল জলভাগে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, কোনো কোনো স্থানে এর বিস্তৃতি মূল চেলা নদীর অংশবিশেষকেও ছাড়িয়ে গেছে।

নদীর তীর ও গতিপথের এমন পরিবর্তনে আশপাশের অন্তত ১০টি গ্রামের মানুষের মধ্যে ভিটেমাটি হারানোর আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। অনেক কৃষক কৃষিজমি নদীতে বিলীন হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন।

নদীর কাছাকাছি থাকা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও কবরস্থান নিয়েও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।

রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়ে একটি শক্তিশালী প্রভাবশালী চক্র গড়ে ওঠার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব কাজে লাগিয়ে ওই চক্র নদী থেকে বালু উত্তোলন নিয়ন্ত্রণ করছে।

স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের সমর্থকদের বিভিন্ন অংশের লোকজন পরস্পরের সঙ্গে সমন্বয় করে এই বালু উত্তোলন কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করছেন।

তবে এসব অভিযোগের ঘটনা পু‌লিশ প্রশাসনকে ম‌্যা‌নেজ করে এবং সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতা বা অভিযুক্ত ব্যক্তিদের নেতৃ‌ত্বে বালু লুটপা‌টের কর্মকান্ড চল‌ছে।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, শতাধিক ড্রেজার যদি প্রকাশ্যে দিন-রাত নদীতে চলতে পারে, তাহলে এসব যন্ত্রের মালিক কারা, কার অনুমতিতে বা কীভাবে তারা নদীতে অবস্থান করছে এবং উত্তোলিত বালু কোথায় যাচ্ছে-এসব বিষয় খতিয়ে
দে‌খে ও না দেখার বান কর‌ছে।

তাঁদের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। ফলে শ্রমিকদের বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্ন অভিযান হলেও মূল নিয়ন্ত্রকেরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছেন। এসব দেখার কেউ নেই।

নৌ পু‌লিশ থানা পু‌লিশ ও উপ‌জেলা প্রশাসন ম‌্যা‌নেজ করে প্রতিরা‌তে বালু উত্তোলন কর‌ছে প্রভাবশালী সি‌ন্ডি‌কেট। সীমানা জটিলতায় সমন্বয়ের ঘাটতি মৃত চেলা নদীর সংশ্লিষ্ট অংশে অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রেও প্রশাসনিক সীমানা নিয়ে জটিলতা রয়েছে।

এসব এলাকাটি প্রশাসনিকভাবে দোয়ারাবাজার উপজেলার নরসিংহপুর ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হলেও সংশ্লিষ্ট মৌজা ছাতক উপজেলায় ইসলামপুর ইউপির জ‌নৈক প্রতি‌নি‌ধির নেতৃ‌ত্বে প্রতিরা‌তে লুটপা‌ট অবা‌ধে চল‌ছে।

দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা, নদীপথের বিস্তৃতি এবং পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় নিয়মিত নজরদারি করাও কঠিন বলে জানিয়েছে প্রশাসন ও পুলিশ। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই প্রশাসনিক জটিলতার সুযোগেই বালু উত্তোলনকারীরা বারবার নদীতে ফিরে আসছে।

তাঁদের দাবি, দুই উপজেলার প্রশাসন, পুলিশ, নৌ-পুলিশ, আনসার ও পরিবেশ অধিদপ্তরের সমন্বয়ে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

অভিযান হলেও থামছে না বালু তোলা সম্প্রতি রাতে দোয়ারাবাজার উপজেলা প্রশাসনের একটি দল সেখানে অভিযান চালিয়ে দুই শ্রমিককে আটক করে।

পরে তাঁদের এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযানে বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত ড্রেজারগুলো জব্দ করা হয়নি। অভিযান শেষ হওয়ার পর আবারও নদীতে বালু উত্তোলন শুরু হয়েছে বলে তাঁদের দাবি।

Manual7 Ad Code

স্থানীয়রা বলছেন, শুধু শ্রমিক আটক করে বা জরিমানা দিয়ে বালু উত্তোলন বন্ধ করা সম্ভব নয়। বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত ড্রেজার, সেভ মেশিন ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি জব্দ করার পাশাপাশি অর্থের উৎস এবং মূল নিয়ন্ত্রকদের শনাক্ত করতে হবে।

পরিবেশের ওপর ভয়াবহ প্রভাব হাওর এরিয়া আপলিফটমেন্ট সোসাইটির (হাউস) নির্বাহী পরিচালক সালেহীন চৌধুরী শুভ বলেন, মৃত চেলা নদীতে যেভাবে বালু উত্তোলন চলছে, তাতে নদীর পরিবেশ ও প্রতিবেশব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর প্রভাব আশপাশের জনবসতি ও মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার ওপর পড়তে পারে।

তিনি নদীভাঙন রোধ এবং অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে দ্রুত যৌথ টাস্কফোর্সের কার্যকর অভিযান পরিচালনার দাবি জানান।

ছাতক নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক অরবিন্দ সরকার নদীতে বালু উত্তোলন এবং তীরবর্তী এলাকার ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, সীমাহীন বালু উত্তোলনের কারণে নদীর তীর ও কলাবাগান এলাকার ক্ষতি দৃশ্যমান।

এ ঘটনায় গত সেপ্টেম্বরে ছাতক নৌ-পুলিশের পক্ষ থেকে একা‌ধিক মামলা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, নিয়মিত অভিযান চালানো হলেও পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় ২৪ ঘণ্টা নদী এলাকায় পাহারা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

দোয়ারাবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অরূপ রতন সিংহ বলেন, এলাকাটি ভৌগোলিকভাবে দুর্গম এবং সেখানে যাতায়াত কঠিন।

এ কারণে নিয়মিত অভিযান পরিচালনায় নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে মোবাইল কোর্ট ও টাস্কফোর্সের মাধ্যমে অভিযান চালিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ছাতক নৌ-পুলিশের একটি স্থায়ী বা অস্থায়ী ফাঁড়ি স্থাপন করা প্রয়োজন। পুলিশ, নৌ-পুলিশ, আনসার ও উপজেলা প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে অবৈধ বালু উত্তোলন নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে।

Manual1 Ad Code

এব‌্যাপা‌রে সুনামগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. মহাইমিনুল হক বলেন, অবৈধ ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের কারণে নদীর প্রতিবেশব্যবস্থা ও স্থানীয় পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় টাস্কফোর্সের সমন্বিত অভিযানের মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

নদী বাঁচাতে কঠোর পদক্ষেপের দাবি স্থানীয়দের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয় যারই হোক, নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে তদন্তের আওতায় আনতে হবে।

Manual5 Ad Code

একই সঙ্গে ড্রেজার ও সেভ মেশিন জব্দ, বালু পরিবহন বন্ধ এবং উত্তোলিত বালুর পরিমাণ ও অর্থনৈতিক লেনদেন খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

তাঁদের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে মৃত চেলার তীরবর্তী আরও বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে চলে যেতে পারে। হারিয়ে যেতে পারে কৃষিজমি, বসতভিটা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।

Manual7 Ad Code

প্রশ্ন উঠেছে-শতাধিক ড্রেজার দিয়ে যদি দিন-রাত নদীর বুক চষে বালু তোলা হয়, তাহলে এই বিপুল বালু উত্তোলনের পেছনে কারা? কোথায় যাচ্ছে কোটি কোটি টাকার বালু?

আর নদী ও জনপদ ধ্বংসের এই দায়ই বা নেবে কে? মৃত চেলা নদী এখন শুধু বালু উত্তোলনের জায়গা নয়; এটি হয়ে উঠেছে নদী, পরিবেশ ও জনপদ রক্ষায় প্রশাসনের কার্যকারিতা যাচাইয়েরও একটি বড় পরীক্ষা।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ২৮ বার

Share Button

Callender

October 2026
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031