শিরোনামঃ-

» বাজারে জাল টাকার ছড়াছড়ি; সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার পরামর্শ

প্রকাশিত: ০৩. জুন. ২০১৭ | শনিবার

Manual1 Ad Code

এসবিএন ডেস্কঃ রোজা ও ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে দেশি-বিদেশি জাল টাকার নোট তৈরির প্রতারকচক্র সক্রিয়া হয়ে ওঠেছে। রোজার শুরুতেই তারা ১শ, ৫শ ও এক হাজার টাকার জাল নোট তৈরিতে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে গোপনে কারখানা গড়ে তুলছে বলে জানা গেছে।

তবে এবার যেন প্রতারকচক্র জাল টাকার নোট বাজারে ছাড়তে না পারে, সেজন্য গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আগে থেকেই নজরদারি শুরু করেছে। প্রতারকদের ধরতে এরই মধ্যে অভিযানে নেমেছে তারা। একই সঙ্গে এখন টাকা লেনদেনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক থাকার জন্য সবাইকে অনুরোধ জানিয়েছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।

পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘দেশি-বিদেশি একাধিক চক্র দীর্ঘদিন ধরে জাল টাকার নোটের ব্যবসা চালিয়ে আসছিল। মূলত ঈদ সামনে রেখে চক্রটি ব্যবসায় নামে। বছরের অন্য সময় ওই চক্রের সদস্যদের তৎপরতা তেমন দেখা না গেলেও ঈদ সামনে রেখে তারা সক্রিয় হয়ে ওঠে। এ কারণে অতীতে যারা এ ধরনের অপরাধে জড়িত ছিল, তাদের নজরদারিতে আনা হয়েছে। গতিবিধি লক্ষ্য করা হচ্ছে। তেমন কিছু পেলে সঙ্গে সঙ্গেই অভিযান পরিচালনা করা হবে।’

রোজা ও ঈদ উপলক্ষে গত ২৪ মে রাজধানীর সার্বিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত এক বৈঠকে ডিএমপি কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া জানান- রোজা ও ঈদের সার্বিক নিরাপত্তায় সাদা পোশাকে ও ইউনিফর্মে বিশেষ টিম থাকবে। জাল টাকার নোট রোধে বিভিন্ন মার্কেট শপিং মলে পুলিশ নিরাপত্তা দেবে। পাশাপাশি মার্কেটের নিরাপত্তার জন্য মার্কেট মালিক সমিতিকে সিসিটিভি, আর্চওয়ে, এসে কন্ট্রোল মেশিনসহ নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। বাস টার্মিনাল থেকে রাতের বেলায় সব বাসের যাত্রীদের অবশ্যই ভিডিও করে রেখে বাস টার্মিনাল থেকে বের করতে হবে।

Manual7 Ad Code

পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্র থেকে জানা গেছে- নারায়ণগঞ্জ, সাভার, গাজীপুর, টঙ্গী, কেরাণীগঞ্জ, কামরাঙ্গীরচরসহ রাজধানীর ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় প্রতারকরা জাল টাকার নোটের ব্যবসা করে থাকে। এসব স্থান থেকে সারাদেশে জাল টাকার নোট বণ্টন হয়। ওই চক্রের একজন গডফাদার থাকে। নামও ব্যবহার করে একাধিক। এ কারণে তাদের অবস্থান বা পরিচয় নিশ্চিত হতে বেশ বেগ পেতে হয়। বর্তমানে রাজধানীতে এই টাকার বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে ইব্রাহিম নামে একজন। এছাড়া জাল টাকার নোট তৈরির মূল হোতা জাকির মাস্টার ও কাওছার মিয়া দীর্ঘদিন গাঢাকা দিয়ে আছে। এরা আত্মগোপনে থাকলেও সিন্ডিকেট এখনও সক্রিয় রয়েছে। কল্যাণপুরের নার্গিস আক্তার, শারমিন আক্তার, সোহেল, সাগর, রোজিনাসহ শতাধিক পুরুষ ও নারী এ টাকা তৈরি এবং বণ্টনে সার্বক্ষণিক কাজ করছে বলে গোয়েন্দাদের কাছ থেকে জানা গেছে।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানায়- এক লাখ টাকা তৈরি করতে তিন হাজার টাকা খরচ হয়। আর বিক্রি হয় ছয় হাজার থেকে আট হাজার টাকায়। পরে বিভিন্ন হাত ঘুরে এ টাকা ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। একই আকারের ছোট মুদ্রার লেখা ধুয়ে বড় মুদ্রার ছাপ দিয়ে যেসব জাল টাকার নোট বানানো হয়, তার দাম বেশি এবং ধরাও কঠিন ১শ টাকার নোট সাদা করে ৫শ বা ১ হাজার টাকার জাল নোট বানানো হয়। আর সাধারণ আর্ট পেপারে ছাপ দিয়েও জালনোট বানানো হয়। এছাড়া টাকা তৈরিতে মেশিনসহ ল্যাপটপ, প্রিন্টার, পেনড্রাইভ, নিরাপত্তা সুতা, টাকা বানানোর জন্য বিভিন্ন ডায়াসও তৈরি করতে হয়।

Manual5 Ad Code

জাল টাকার নোটের চক্রের হোতারা দরিদ্র মানুষকে বাছাই করে মূলত নোট ছড়ানোর কাজে ব্যবহার করে। এতে তাদের তিন ধরনের উপকার হয়। প্রথমত, সে ব্যক্তি ধরা পড়লেও মূল হোতাদের সম্পর্কে কোনো তথ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানাতে পারে না। দ্বিতীয়ত, আর্থিকভাবে দুর্বল হওয়ায় তারা বেঈমানি করার সাহস করে না এবং তৃতীয়ত, তাদের অল্প টাকায় এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজের জন্য পাওয়া যায়। খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে মূল কারবারিদের চুক্তি থাকে এক লাখ টাকার জাল নোট ছড়িয়ে দিতে পারলে ১০ হাজার টাকা পাবে। এরাই পরে রাজধানীসহ দেশের সব জেলার সর্বত্র বিভিন্ন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান, অভিজাত মার্কেট থেকে শুরু করে ফুটপাত পর্যন্ত সর্বত্র বেচাকেনার ভিড়ে বাজারে ছড়িয়ে দেয়। এ কাজে আবার উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারীও জড়িত।

পুলিশ কর্মকর্তারা জানান- দীর্ঘদিন ধরে ৩৫-৪০টি চক্র জাল টাকার নোটের কারবার করে আসছে। এর মধ্যে মিরপুরের জাকির গ্রুপ, খিলগাঁও, সবুজবাগ ও বাসাবো এলাকায় লোকমান গ্রুপ, পুরান ঢাকায় ইমন গ্রুপ, মোহাম্মদপুর ও ধানমন্ডি এলাকায় কাওসার গ্রুপ, জাল টাকা তৈরির অন্যতম গুরু নুরুজ্জামান, সগীর আলী, মোস্তফা চিশতী এবং মাহবুবসহ ৪০টি চক্র জাল টাকার রমরমা অবৈধ ব্যবসা করে আসছে। এদের আবার শাখা-প্রশাখাও রয়েছে। এদের মধ্যে কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হলেও আবার আইনের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে গেছে। এ কারণে তাদের দৌরাত্ম্য রোধ করা যাচ্ছে না। আবার জাল টাকার নোটের কারবারিদের কাছে দক্ষ কারিগর হিসেবে শান্তাও রয়েছে। তার মাসিক বেতন ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা। জাল টাকার নোটের আরেকজন বড় ব্যবসায়ী রোজিনা আক্তার। প্রতিদিন মিরপুর থেকে যাত্রাবাড়ী পর্যন্ত বিভিন্ন দোকানে গিয়ে জালটাকা দিয়ে পণ্য কেনে জাল টাকার কারবারি শিরিন আক্তারও। এভাবে আরও অনেকেই জড়িত রয়েছে।

র‌্যাব ও গোয়েন্দা পুলিশ এ চক্রের সদস্যদের গ্রেফতার ও পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষ অভিযান শুরু করেছে। এরই মধ্যে বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

Manual7 Ad Code

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান- জাল টাকার নোটের ব্যবসায়ী চক্রের প্রত্যেকেই পেশাদার। তারা একদিকে জাল টাকার নোট তৈরি করে, অন্যদিকে জাল টাকার ব্যবসাও করে। এসব চক্রের অনেক সদস্যই এ ব্যবসার সঙ্গে অনেক বছর ধরে জড়িত। তারা রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে জাল টাকা তৈরি করে। ধরা পড়ার ভয়ে তারা এক বাসায় বেশি দিন থাকে না। কয়েক মাস পরপর তারা বাসা বদলে চলে যায়, এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায়। সেখানেই গড়ে তোলে জাল টাকা তৈরির কারখানা।

Manual4 Ad Code

জাল টাকার নোট প্রতিরোধ টিমের কর্মকর্তা জানান- এক সময় এ সিন্ডিকেটে কোনো নারী সদস্য ছিল না। এখন অনেক নারী সদস্য এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। প্রতিটি স্তরেই এ সিন্ডিকেটের নারী সদস্য রয়েছে। কখনো গৃহিণী, কখনো কলেজ ছাত্রী সেজে জাল টাকা বহন করে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দিচ্ছে তারা। আবার এদের মাধ্যমেই পণ্য কেনাকাটা করে মার্কেটে জাল টাকার নোটের বিস্তার ঘটায়। এজন্য তাদের দেওয়া হয় মোটা অংকের কমিশন। ধরা পড়লে ও তাদের আইনি সহায়তা দেয় সিন্ডিকেটের সদস্যরা।

র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান- জালিয়াতরা যাতে রোজা ও ঈদের বাজারে জালনোট ছড়াতে না পারে সেজন্য র‌্যাবের গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। এ বিষয়ে এরই মধ্যে র‌্যাবের সব ব্যাটালিয়নকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন শপিং মল ও বাজারে জালনোট শনাক্ত করার জন্য ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মেশিন রয়েছে।

সন্দেহ হলেই লেনদেনের পূর্বে ক্রেতা-বিক্রেতা সেখানে টাকা যাচাই করতে পারবেন। গোয়েন্দা ও অপরাধ তথ্য বিভাগের (পশ্চিম) উপ-কমিশনার (ডিসি) মো. সাজ্জাদুর রহমান বলেন- বিভিন্ন উৎসবে অর্থের লেনদেন বেড়ে যায় বলে এসব চক্রের সদস্যরা সক্রিয় হয়ে ওঠে। এ কারণে এবার আমরা আগে থেকেই সতর্কতা অবলম্বন করেছি। এর আগে যাদের গ্রেফতার করা হয়েছিল, তাদের ওপর নজরদারি রাখছি।

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের ডিসি মাসুদুর রহমান জানান- জাল টাকা তৈরির সম্ভাব্য স্থানগুলোতে অনেক আগেই নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। খোঁজ-খবরও নেওয়া হচ্ছে। এ চক্রকে ধরতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে পুলিশ। এরই মধ্যে এসব চক্রের অনেক সদস্যকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। কোথাও জাল টাকার নোট তৈরি হচ্ছে কি-না জানা থাকলে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশকে গোপনে জানাতে অনুরোধ করেছেন তিনি। এছাড়াও জাল টাকা সংক্রান্ত প্রতিটি মামলাই পুলিশ গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করছে।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৮৬৫ বার

Share Button

Callender

October 2026
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031