শিরোনামঃ-

» ডেঙ্গুর বিস্তার ঠেকাতে চাই সম্মিলিত উদ্যোগ, সচেতনতার বিকল্প নেই

প্রকাশিত: ০৬. অক্টোবর. ২০২৬ | মঙ্গলবার

Manual3 Ad Code

মাওলানা মো. ছালিম আহমদ খানঃ
বর্ষা এলেই বাংলাদেশে ডেঙ্গুর আতঙ্ক নতুন করে দেখা দেয়। তবে ডেঙ্গু এখন আর কেবল বর্ষাকেন্দ্রিক একটি মৌসুমি রোগ হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই।

বছরের বিভিন্ন সময়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হচ্ছে। এর ফলে হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে রোগীর চাপ, উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছে পরিবারগুলো।

বিশেষ করে জ্বরের পাশাপাশি ডেঙ্গুর জটিলতা দেখা দিলে পরিস্থিতি দ্রুত গুরুতর হয়ে উঠতে পারে।

Manual5 Ad Code

ডেঙ্গু ভাইরাস বহনকারী এডিস মশাই এই রোগের প্রধান বাহক। কিন্তু এডিস মশার বিস্তারকে শুধু মশার সমস্যা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি বোঝা যাবে না।

আমাদের চারপাশে জমে থাকা পানি, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নির্মাণাধীন ভবনে জমে থাকা পানি এবং নাগরিক অসচেতনতার সঙ্গে ডেঙ্গুর বিস্তারের সম্পর্ক রয়েছে।

সামান্য জমা পানিই হয়ে উঠতে পারে বড় ঝুঁকি

এডিস মশা সাধারণত মানুষের বসতবাড়ির কাছাকাছি ছোট ছোট পাত্র বা স্থানে জমে থাকা পানিতে বংশবিস্তার করতে পারে।

Manual7 Ad Code

বাড়ির ছাদ, বারান্দা কিংবা আঙিনায় পড়ে থাকা বোতল, কৌটা, টব, পুরোনো টায়ার, ডাবের খোসা অথবা যেকোনো পাত্রে পানি জমে থাকলে সেখানে মশার প্রজননের সুযোগ তৈরি হয়।

Manual4 Ad Code

অনেক সময় বড় কোনো জলাশয়ের দিকে আমাদের নজর থাকে, অথচ ঘরের আশপাশে থাকা ছোট একটি পাত্রের জমা পানিকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। অথচ ডেঙ্গু প্রতিরোধে এই ছোট ছোট জায়গাগুলোই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কেন বাড়ছে ডেঙ্গুর ঝুঁকি?

ডেঙ্গুর বিস্তারের পেছনে একক কোন কারণ নেই। শহর ও নগর এলাকায় দ্রুত জনবসতি বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত নির্মাণকাজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি, পানি নিষ্কাশনের সমস্যা এবং বিভিন্ন স্থানে দীর্ঘসময় পানি জমে থাকার সুযোগ এডিস মশার জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।

এর সঙ্গে আবহাওয়ার পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ। তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত ও আর্দ্রতার পরিবর্তন মশার বিস্তার ও রোগ সংক্রমণের পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে শুধু একটি নির্দিষ্ট মৌসুমে নয়, বছরের অন্যান্য সময়েও ডেঙ্গুর ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

Manual4 Ad Code

জ্বর হলেই অবহেলা নয়

ডেঙ্গুর অন্যতম সাধারণ উপসর্গ জ্বর। এর সঙ্গে মাথাব্যথা, শরীর ও পেশিতে ব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, বমি বমি ভাব কিংবা শরীরে র‍্যাশ দেখা দিতে পারে। তবে সব রোগীর উপসর্গ এক রকম নাও হতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জ্বর কমে যাওয়াকে সবসময় সুস্থ হয়ে যাওয়ার লক্ষণ হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। ডেঙ্গুর কিছু গুরুতর জটিলতা জ্বর কমার সময় বা পরবর্তী সময়ে দেখা দিতে পারে।

তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তপাত, অতিরিক্ত দুর্বলতা, অস্বাভাবিক অস্থিরতা, দ্রুত শ্বাস নেওয়া, শরীর ঠান্ডা হয়ে যাওয়া কিংবা রোগীর অবস্থার হঠাৎ অবনতি হলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক এবং অন্যান্য শারীরিক জটিলতা থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে অবহেলা করা উচিত নয়।

ডেঙ্গু প্রতিরোধের শুরুটা হতে হবে ঘর থেকেই

ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপগুলোর একটি হলো এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। এর জন্য নিয়মিত বাড়ির ভেতর ও আশপাশ পরিদর্শন করা দরকার।

যেসব পাত্রে পানি জমে থাকতে পারে সেগুলো খালি করে পরিষ্কার করতে হবে। প্রয়োজনীয় পানির পাত্র ঢেকে রাখতে হবে। ফুলের টব, ছাদ, বারান্দা, ড্রেনের আশপাশ, পুরোনো টায়ার ও পরিত্যক্ত সামগ্রীতে পানি জমে আছে কি না-নিয়মিত দেখতে হবে।

শুধু নিজের বাড়ি পরিষ্কার রাখলেই দায়িত্ব শেষ নয়। পাশের বাড়ি, গলি, নির্মাণাধীন ভবন কিংবা প্রতিষ্ঠানের আশপাশেও যদি পানি জমে থাকে, তাহলে সেখান থেকেও মশার বিস্তার ঘটতে পারে। তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রয়োজন এলাকাভিত্তিক উদ্যোগ।

দিনের মশা, তাই দিনের সুরক্ষাও জরুরি

অনেকের ধারণা, মশা মূলত রাতে কামড়ায়। এডিস মশার ক্ষেত্রে এই ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। দিনের বেলাতেও এডিস মশা সক্রিয় থাকতে পারে। তাই শুধু রাতে মশারি ব্যবহার করাই যথেষ্ট নয়; দিনের বেলাতেও মশার কামড় এড়ানোর ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

সম্ভব হলে শরীরের অধিকাংশ অংশ ঢেকে রাখা, জানালা-দরজায় নেট ব্যবহার করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মশা প্রতিরোধক ব্যবহার করা যেতে পারে।

শুধু মশা মারলে হবে না, জন্মস্থানও ধ্বংস করতে হবে

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশা নিধন কার্যক্রমের পাশাপাশি মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি এলাকায় নিয়মিত ওষুধ ছিটালেও যদি সেখানে পানি জমে থাকার জায়গাগুলো অক্ষত থাকে, তাহলে নতুন করে মশা জন্মানোর সুযোগ থেকেই যায়।

তাই সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি নাগরিকদেরও নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্ব নিতে হবে। নির্মাণ প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস, মার্কেট এবং আবাসিক ভবনের ব্যবস্থাপনাকেও এ বিষয়ে সক্রিয় হতে হবে।

ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন প্রয়োজন

ডেঙ্গু মোকাবিলাকে শুধু স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্ব হিসেবে দেখলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। এটি একই সঙ্গে স্বাস্থ্য, পরিবেশ, পরিচ্ছন্নতা ও নাগরিক ব্যবস্থাপনার বিষয়।

প্রতিটি পরিবার যদি সপ্তাহে অন্তত একদিন নিজের ঘর ও আশপাশে জমে থাকা পানি খুঁজে পরিষ্কার করে, প্রতিটি প্রতিষ্ঠান যদি নিজস্ব প্রাঙ্গণ পরিচ্ছন্ন রাখে এবং স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালিত হয়, তাহলে এডিস মশার প্রজনন অনেকটাই কমানো সম্ভব।

ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র কোন একটি ওষুধ বা একটি প্রতিষ্ঠানের একক উদ্যোগ নয়; বরং সচেতনতা, পরিচ্ছন্নতা এবং সম্মিলিত দায়িত্ববোধ।

আজ একটি ছোট পাত্রের জমে থাকা পানি ফেলে দেওয়া হয়তো খুব সাধারণ একটি কাজ মনে হতে পারে। কিন্তু সেই কাজটিই হয়তো আগামীকাল একটি পরিবারকে ডেঙ্গুর ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে পারে।

তাই ডেঙ্গু নিয়ে আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন সচেতনতা ও দ্রুত পদক্ষেপ।

নিজের ঘর থেকে শুরু হোক পরিচ্ছন্নতার অভিযান, আর সম্মিলিত উদ্যোগে গড়ে উঠুক ডেঙ্গুমুক্ত পরিবেশ।

চেয়ারম্যান, হাফিজ সোসিয়াল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৬০ বার

Share Button

Callender

October 2026
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031