শিরোনামঃ-

» ৮৬ কোটি টাকার সড়কে নিম্নমানের কাজের অভিযোগ; এমপির বিরুদ্ধে এক কোটি টাকা চাঁদা দাবির পাল্টা অভিযোগ!

প্রকাশিত: ২৮. অক্টোবর. ২০২৬ | বুধবার

Manual4 Ad Code

বিশ্বম্ভরপুরে গার্ডওয়াল হেলে পড়া ও সড়ক নির্মাণে অনিয়ম নিয়ে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী; তদন্ত দাবি এমপি নুরুল ইসলামের, ঠিকাদারকে সতর্ক করার কথা স্বীকার সওজের

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধিঃ
সুনামগঞ্জ-কাছিরগাথি-বিশ্বম্ভরপুর সড়কের প্রায় ৮৭ কোটি টাকার উন্নয়নকাজ ঘিরে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, কারিগরি অনিয়ম ও ধীরগতির অভিযোগে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে এলাকাবাসীর মধ্যে।
সেতুর সংযোগ সড়কের পাশে নির্মিত গার্ডওয়ালের একাংশ পাঁচ ফুট সরে যাওয়া ও বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
Manual3 Ad Code

এ অবস্থায় কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলতে গিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম নুরুলের পথ আটকে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এলাকাবাসী।

এ ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে এক কোটি টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয় গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়।
প্রকল্পের কাজের মান নিয়ে ক্ষোভ এবং চাঁদা দাবির পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ঘিরে এলাকায় নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।

একদিকে নিম্নমানের কাজের অভিযোগ, অন্যদিকে চাঁদা দাবির অভিযোগ-দুটিরই নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে।

গত বুধবার (২৮ অক্টোবর) সকালে সুনামগঞ্জ সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীকে সঙ্গে নিয়ে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন, সংসদ onetv1news@gmail.com সদস্য নুরুল ইসলাম নুরুল।

পরে স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি নিজের বিরুদ্ধে ওঠা চাঁদা দাবির অভিযোগের তদন্ত দাবি করেন।
একই সঙ্গে প্রকল্পের কাজে অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
পথ আটকে ক্ষোভ, গার্ডওয়ালে ত্রুটি সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম নুরুল জানান, মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার সলুকাবাদ ইউনিয়নের রতারগাঁও হাইস্কুল মাঠে একটি ফুটবল টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে ফেরার পথে স্থানীয় বাসিন্দারা তাঁর গাড়ির গতিরোধ করেন।
তাঁরা সেতুর সংযোগ সড়কের পাশে নির্মিত গার্ডওয়ালের বিভিন্ন ত্রুটি দেখিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

এমপির জানান, সরেজমিনে গার্ডওয়ালের একাংশ প্রায় পাঁচ ফুট সরে যাওয়া এবং বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখতে পান তিনি।

পরে কাজের সাইটে থাকা প্রকৌশলী ও ঠিকাদারের প্রতিনিধিদের ত্রুটিপূর্ণ অংশ দেখানো হয়।
আলোচনায় গার্ডওয়ালটি ভেঙে নতুন করে নির্মাণের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও উঠে আসে।

এলাকাবাসীকে শান্ত করে তিনি গত  বুধবার সকাল ১১টায় সওজের নির্বাহী প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে কাজের মান যাচাইয়ের আশ্বাস দেন। নির্ধারিত সময়ে নির্বাহী প্রকৌশলী ও স্থানীয় লোকজন উপস্থিত হলেও ঠিকাদার উপস্থিত হননি বলে জানান সংসদ সদস্য।

‘চাঁদা দাবির অভিযোগের ঘটনার তদন্ত চাই’ এম‌পি নুরুল ইসলাম নুরুল বুধবার (২৮ অক্টোবর)’র প্রেস ব্রিফিংয়ে নুরুল ইসলাম নুরুল বলেন, “আমার বিরুদ্ধে এক কোটি টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ করা হয়েছে। আমি এই অভিযোগের তদন্ত দাবি করছেন। একই সঙ্গে সড়কের কাজে গাফিলতি থাকলে সেটিও তদন্ত করে প্রমাণ করা হোক।”

তিনি অভিযোগ করেন, এলাকাবাসীর ক্ষোভের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তাঁর বিরুদ্ধে আবেদন দেওয়া হয়েছে।

তাঁর দাবি, একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট প্রকল্পের কাজে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে চাইছেন।

এমপি বলেন, “জনগণের চলাচলের সড়কের কাজের মান নিশ্চিত করতে গিয়ে আমাকে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করা হলে তা সফল হবে না। স্ক্যান্ডাল রটিয়ে আমাকে দমিয়ে রাখা যাবে-এমন ধারণা ভুল।

Manual1 Ad Code

সদর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার প্রত্যেকটি কাজ আমরা সঠিকভাবে আদায় করে নেব।”

তাঁর দাবি, কেউ চাঁদা চেয়ে থাকলে তার বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

সাবঠিকাদারকে পুলিশ দিয়ে হয়রানি করার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, হয়রানি করার উদ্দেশ্য থাকলে আগেই ব্যবস্থা নেওয়া যেত। এ ধরনের অপবাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানান তিনি।

তবে চাঁদা দাবির অভিযোগের বিষয়ে সাবঠিকাদার শফিকুল ইসলামের বক্তব্য এবং অভিযোগের পক্ষে-বিপক্ষে নথিপত্র স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে অভিযোগটির সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।

৮৬ কোটি টাকার প্রকল্পে বিল ৩৭ কোটি সওজ সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ সড়ক বিভাগের বিভিন্ন সড়ক, সেতু ও কালভার্ট জরুরি পুনর্বাসন প্রকল্পের আওতায় সুনামগঞ্জ-কাছিরগাথি-বিশ্বম্ভরপুর সড়কের লালপুর-সালামপুর সেতুর ১ ও ২ নম্বর অংশ এবং প্রায় পাঁচ কিলোমিটার সড়ক সংস্কার ও গার্ডওয়াল নির্মাণের কাজ চলছে। প্রকল্পটির বরাদ্দ ৮৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা।

রাজধানী ঢাকার ঠিকাদার মো. বদরুল ইকবাল এ কাজের দায়িত্ব পান। প্রকল্প বাস্তবায়নের শুরুর দিকে স্থানীয় প্রভাবশালীদের চাপের মুখে সাবঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি।

Manual2 Ad Code

সুনামগঞ্জ সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী জহিরুল ইসলাম জানান, প্রকল্পের প্রায় অর্ধেক কাজ সম্পন্ন হয়েছে।

এ পর্যন্ত বিল দেওয়া হয়েছে ৪৩ শতাংশ, যার পরিমাণ ৩৭ কোটি ২৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা। তিনি বলেন, “এমপি মহোদয় গার্ডওয়াল হেলে পড়ার যে অভিযোগ করেছেন, বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। কাজ চলমান থাকায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে। ঠিকাদারকে বারবার ভালোভাবে কাজ করার জন্য বলা হয়েছে এবং নিম্নমানের কাজ না করার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। তাঁরাই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবেন।”

২০ কোটি টাকা বিনিয়োগের দাবি, টাকা ফেরত না পাওয়ার অভিযোগ প্রকল্পটির সাবঠিকাদারি নিয়ে আরেকটি বিরোধের তথ্য সামনে এসেছে।

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা ও জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য, তাহিরপুরের বালিজুড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজাদ হোসেন দাবি করেছেন, প্রকল্পে তিনি প্রায় ২০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন।
Manual2 Ad Code

কিন্তু ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন কৌশলে কাজের দায়িত্ব সিলেটের শফিকুল ইসলামকে দেওয়া হয় এবং তাঁর বিনিয়োগের টাকা ফেরত দেওয়া হয়নি।

বুধবার এই প্রতিবেদককে আজাদ হোসেন বলেন, সাবঠিকাদার নিয়োগের সময় শফিকুল ইসলাম সাক্ষী ছিলেন। তাঁর দাবি, তৎকালীন ঠিকাদার মো. বদরুল ইকবালও পরে দেশ ছেড়ে চলে যান।

আজাদ হোসেনের আরও অভিযোগ, প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম হচ্ছে এবং উত্তোলিত বিলের টাকা সড়ক বিভাগের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও ঠিকাদারের প্রতিনিধিরা ভাগাভাগি করে নিচ্ছেন।

তবে অর্থ ভাগাভাগির এ অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা নথি বা সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সওজের নির্বাহী প্রকৌশলীও কারও ব্যক্তিগত পাওনা বা বিনিয়োগের বিষয়ে তাঁদের কিছু জানা নেই বলে জানিয়েছেন।

‘ইট থেকে গার্ডওয়াল—সবই নিম্নমানের’ গত বুধবার সরেজমিনে সড়ক এলাকায় গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের ক্ষোভের চিত্র পাওয়া যায়।

লালপুর গ্রামের বাসিন্দা বাদশা মিয়া বলেন, বর্তমানে সড়কে যে কাজ চলছে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ইট থেকে শুরু করে গার্ডওয়াল—সবকিছুতেই নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ করেন তিনি।

বাদশা মিয়ার জানান, সড়ক নির্মাণে বালু ও মাটি দিয়ে ভরাট করার কথা থাকলেও ফসলি জমি কেটে মাটি নেওয়া হচ্ছে। এভাবে কাজ চলতে থাকলে আগামী বর্ষার আগেই সড়ক ভেঙে নদী বা খালে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তিনি বলেন, “এই দুই নম্বর কাজের আমাদের কোনো প্রয়োজন নেই। অবিলম্বে কাজ বন্ধ করে সঠিক মান নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে বিশ্বম্ভরপুরের বাসিন্দা আরিফ রব্বানী হিমেল অভিযোগ করেন, কাজের শুরু থেকেই কারিগরি নিয়ম মানা হচ্ছে না।

তাঁর দাবি, প্রকৌশলগত মানদণ্ড অনুযায়ী মাটির ‘আর্থ কম্প্যাকশন’ বা মাটি শক্ত করার কাজ এবং প্রয়োজনীয় পুরুত্ব নিশ্চিত করা হয়নি।

তাঁর ভাষায়, “নির্ধারিত মান অনুযায়ী কাজের পাঁচ শতাংশও করা হয়নি বলে আমাদের ধারণা। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল বিভাগ সরেজমিনে পরীক্ষা করলেই প্রকৃত অবস্থা বোঝা যাবে।”
তিনি আরও বলেন, গার্ডওয়ালের গোড়া ও ঢালু অংশের মাটি কাটার কারণে দেয়াল হেলে পড়তে শুরু করেছে বলে তাঁদের আশঙ্কা।
সড়কের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ‘মেকাডাম’-মাটি ও পাথরের মিশ্রণ-ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ তোলেন তিনি।

তদন্তেই বেরিয়ে আসুক প্রকৃত চিত্র,প্রায় ৮৭ কোটি টাকার এ প্রকল্পের কাজের মান, গার্ডওয়ালের স্থায়িত্ব, মাটি ও পাথর ব্যবহারের পরিমাণ, কাজের পুরুত্ব এবং বিলের হিসাব নিয়ে একাধিক প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

একই সঙ্গে চাঁদা দাবির অভিযোগ এবং সাবঠিকাদারের বিনিয়োগের টাকা ফেরত না পাওয়ার দাবিও তদন্তের দাবি রাখে।

সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। তবে শুধু সতর্কীকরণ বা দাপ্তরিক আশ্বাসে এলাকাবাসীর ক্ষোভ প্রশমিত হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

এ অবস্থায় প্রকল্পের অনুমোদিত নকশা, কার্যাদেশ, পরিমাপবই, বিলের নথি ও নির্মাণসামগ্রীর গুণগত মান স্বাধীনভাবে পরীক্ষা করা জরুরি।

একই সঙ্গে চাঁদা দাবির অভিযোগেরও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। সরকারি অর্থের অপচয় হয়েছে কি না, কারিগরি ত্রুটি কেন দেখা দিয়েছে এবং দায় কার-এসব প্রশ্নের জবাব তদন্তের মাধ্যমেই স্পষ্ট হওয়া উচিত।

জনগণের দুর্ভোগ কমাতে যে সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ, সেই সড়কই যদি নিম্নমানের কাজের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে, তবে তার দায় এড়ানোর সুযোগ কারও নেই।

এলাকাবাসীর দাবি, অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের আড়ালে যেন প্রকল্পের প্রকৃত অনিয়ম চাপা না পড়ে; বরং স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে কাজের মান নিশ্চিত করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা হোক।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৪১ বার

Share Button

Callender

October 2026
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031