শিরোনামঃ-

» বিশ্ব রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট দিবস ২০২৬

প্রকাশিত: ০৭. মে. ২০২৬ | বৃহস্পতিবার

Manual3 Ad Code

“মানবতায় ঐক্যবদ্ধ”

মোহাম্মদ আমিনুল ইসলামঃ
প্রতি বছর ৮ মে বিশ্ব রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট দিবস পালন করা হয়।

আমার কাছে এই দিনটি শুধু একটি আন্তর্জাতিক দিবস নয় বরং মানবতা, সহমর্মিতা এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক গভীর অনুপ্রেরণার দিন।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যারা যুদ্ধ, দুর্যোগ, রোগব্যাধি কিংবা মানবিক সংকটের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ান, এই দিনটি তাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানানোর দিন।

এই দিবসটি পালন করা হয় হেনরি ডুনান্টের জন্মদিন উপলক্ষে। তিনি ১৮২৮ সালের ৮ মে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় জন্মগ্রহণ করেন।

মানবতার সেবায় তাঁর অবদান আজও পুরো বিশ্বের জন্য এক বড় অনুপ্রেরণা।

তিনি হয়তো কখনো ভাবেননি, যুদ্ধক্ষেত্রে আহত মানুষের জন্য তাঁর ছোট্ট মানবিক উদ্যোগ একদিন বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক আন্দোলনের ভিত্তি হয়ে উঠবে।

রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট আন্দোলনের শুরু হয়েছিল সলফেরিনোর যুদ্ধের বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতা থেকে।

১৮৫৯ সালে ইতালির সলফেরিনোতে ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। হাজার হাজার আহত মানুষ চিকিৎসা ও সাহায্য ছাড়া অসহায় অবস্থায় পড়ে ছিলেন। চারদিকে শুধু কষ্ট, আর্তনাদ আর মৃত্যুর দৃশ্য। হেনরি ডুনান্ট সেই দৃশ্য দেখে গভীরভাবে ব্যথিত হন।

তিনি স্থানীয় মানুষদের নিয়ে আহতদের সেবায় এগিয়ে আসেন। তখন একটি মানবিক কথা খুব পরিচিত হয়ে ওঠে, “তুত্তি ফ্রাতেল্লি” অর্থাৎ “আমরা সবাই ভাই”।

এই অনুভূতিই পরে বিশ্বব্যাপী মানবিক আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করে।  পরে তিনি “এ মেমোরি অব সলফেরিনো” বইটি লেখেন। সেই বই থেকেই মূলত সংগঠিত মানবিক আন্দোলনের ধারণা শক্ত ভিত্তি পায়।

পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ধীরে ধীরে বিশ্বব্যাপী রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট আন্দোলনের বিস্তার ঘটে। আজ বিশ্বের প্রায় ৯১টি দেশে রেড ক্রস বা রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি কাজ করছে।

দুর্যোগ, যুদ্ধ, মহামারি কিংবা যেকোনো সংকটে তারা মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে। শুধু ত্রাণ নয়, রক্তদান, স্বাস্থ্যসচেতনতা, প্রাথমিক চিকিৎসা, যুব উন্নয়ন ও মানবিক সহায়তার নানা কার্যক্রমের মাধ্যমে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য “মানবতায় ঐক্যবদ্ধ” বর্তমান সময়ে খুবই অর্থবহ। এই প্রতিপাদ্য সেই সব স্বেচ্ছাসেবক ও মানবিক কর্মীদের সম্মান জানায়, যারা সংকট ও দুর্দিনে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে কাজ করে যাচ্ছেন।

তারা মানবিক অনুভূতিকে বাস্তব কাজে রূপ দিচ্ছেন এবং বিভক্ত ও জটিল সময়েও মানুষের মাঝে আশা, মর্যাদা ও মানবিকতা ছড়িয়ে দিচ্ছেন। আজকের পৃথিবী নানা সংকটে ভরা।

কোথাও যুদ্ধ, কোথাও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, কোথাও দারিদ্র্য ও বাস্তুচ্যুতি। আবার অনেক ক্ষেত্রে মানুষ মানুষ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।

এমন সময়ে “মানবতায় ঐক্যবদ্ধ” প্রতিপাদ্যটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ভিন্নতা, সীমান্ত কিংবা অবস্থান যাই থাকুক না কেন, মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়ালেই মানবতা আরও শক্তিশালী হয়।

Manual5 Ad Code

বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি দেশের বিভিন্ন মানবিক কার্যক্রমে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

দুর্যোগ ও জলবায়ু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি, বন্যা মোকাবিলা, আগাম মানবিক সহায়তা, উপকূলীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস, বাস্তুচ্যুত ও শরণার্থী সহায়তা, ভাসানচর কার্যক্রম, স্বাস্থ্যসেবা, রক্তদান কর্মসূচি, মনোসামাজিক সহায়তা, ওয়াশ কার্যক্রম, কমিউনিটি উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইন বিষয়ক সচেতনতা তৈরিতে প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

Manual6 Ad Code

বিশেষ করে দুর্যোগের সময় বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির স্বেচ্ছাসেবকদের ভূমিকা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অগ্নিকাণ্ড, ভবন ধস কিংবা অন্যান্য জরুরি পরিস্থিতিতে তারা দ্রুত মানুষের পাশে দাঁড়ায়।

খাদ্য বিতরণ, প্রাথমিক চিকিৎসা, উদ্ধার কার্যক্রম, আশ্রয় সহায়তা এবং জরুরি সেবার মাধ্যমে তারা মানবতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছে।

বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির যুব ও স্বেচ্ছাসেবক কার্যক্রম দেশের মানবিক উদ্যোগের অন্যতম শক্তি।

বর্তমানে দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ইউনিটে হাজারো প্রশিক্ষিত যুব স্বেচ্ছাসেবক মানবিক কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।

রেড ক্রিসেন্ট ইয়ুথের সদস্যরা প্রাথমিক চিকিৎসা, সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, রক্তদান, অগ্নি নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, বৃক্ষরোপণ, স্বাস্থ্যসচেতনতা এবং সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সহশিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে তরুণদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ, নেতৃত্ব এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা তৈরি হচ্ছে।

দুর্যোগ কিংবা যেকোন সংকটময় সময়ে যুব স্বেচ্ছাসেবকদের সাহসী ও আন্তরিক ভূমিকা সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক।

অনেক তরুণ স্বেচ্ছাসেবক নিজেদের নিরাপত্তার কথা না ভেবে মানুষের পাশে দাঁড়ায়। তাদের এই মানবিক চেতনা ভবিষ্যতের জন্য আশার আলো জাগায়।

আমি বিশ্বাস করি মানবিক কাজ শুধুমাত্র বড় কোনো সংগঠন বা বড় পদের বিষয় নয়।

একজন মানুষ আরেকজন মানুষের পাশে দাঁড়ানো থেকেই মানবতার শুরু। আমার নিজের জীবনেও মানবিক কর্মকাণ্ডের সাথে সম্পৃক্ততা অনেক দিনের।

স্কুলজীবন থেকেই রেড ক্রিসেন্ট যুব কার্যক্রমের সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম।

Manual5 Ad Code

ছোটবেলায় প্রাথমিক চিকিৎসা কার্যক্রম, রক্তদান সচেতনতা এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমে মানবিক কাজের প্রতি এক ধরনের ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতা তৈরি হয়।

পরবর্তীতে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সাথে দীর্ঘ সময় কাজ করার সুযোগ হয়েছে।

এই পথচলায় অসংখ্য নিবেদিতপ্রাণ স্বেচ্ছাসেবক ও মানবিক মানুষের সাথে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। তাদের আন্তরিকতা, ত্যাগ ও মানবিকতা আমাকে সবসময় অনুপ্রাণিত করেছে।

বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির প্রাক্তন ট্রেজারার হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আমার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের কষ্ট, দুর্যোগের বাস্তবতা এবং মানবিক সহায়তার গুরুত্ব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে।

বিশেষ করে দুর্যোগের সময় স্বেচ্ছাসেবকদের নিরলস কাজ সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক। মানুষের বিশ্বাসই একটি মানবিক প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় শক্তি।

আমি গর্বের সাথে বলতে চাই, সিলেট ইউনিটের যুব রেড ক্রিসেন্টের প্রতিষ্ঠাতা যুব প্রধান হিসেবে তরুণদের নিয়ে কাজ করার সুযোগ আমার হয়েছে। তরুণদের মানবিক কাজে সম্পৃক্ত হতে দেখা সব সময়ই অনুপ্রেরণাদায়ক।

বর্তমান সময়ে মানবিক মূল্যবোধের প্রয়োজন আগের চেয়ে অনেক বেশি। প্রযুক্তি ও ব্যস্ততার এই সময়ে মানুষ অনেক ক্ষেত্রে একে অপরের অনুভূতি বুঝতে ভুলে যাচ্ছে।

তাই মানবিকতা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার চর্চা আরও বাড়ানো দরকার।  আজও আমাদের সমাজে অনেক মানুষ আছেন যারা অসহায়, সুবিধাবঞ্চিত এবং সাহায্যের অপেক্ষায় আছেন।

কেউ খাবারের কষ্টে, কেউ চিকিৎসার অভাবে, কেউ আবার দুর্যোগে সব হারিয়ে নতুন করে বাঁচার চেষ্টা করছেন। তাদের পাশে দাঁড়ানোই প্রকৃত মানবতা।

বিশ্ব রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট দিবস আমাদের সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়। মানবিক কাজ করার জন্য বড় পরিচয়ের প্রয়োজন হয় না, দরকার একটি মানবিক মন।

Manual3 Ad Code

আজকের এই দিনে বিশ্বের সকল স্বেচ্ছাসেবক, মানবিক কর্মী, চিকিৎসাকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানাই। তারা নিজেদের সময়, শ্রম ও ভালোবাসা দিয়ে মানবতার সেবা করে যাচ্ছেন।

আসুন, আমরা সবাই যার যার অবস্থান থেকে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি।

মানবিক মূল্যবোধ, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে একটি সুন্দর ও মানবিক সমাজ গড়ে তুলি।

মানবতার এই পথচলা কখনো থেমে না যাক। আমরা সবাই মিলে সত্যিকার অর্থে মানবতাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করি।

আয়কর উপদেষ্টা
প্রাক্তন ট্রেজারার
বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি
জাতীয় সদর দপ্তর, ঢাকা
প্রতিষ্ঠাতা যুব প্রধান
যুব রেড ক্রিসেন্ট, সিলেট ইউনিট।

এই সংবাদটি পড়া হয়েছে ৪৮ বার

Share Button

Callender

May 2026
M T W T F S S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031